গ্রামবাংলার মধ্যবিত্ত সংসারের রোজনামচার গল্প

PRIYANKA GOSWAMI
ASSISTANT PROFESSOR
Faculty OF D.EL.ED

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মুর্শিদাবাদ জেলার প্রত্যন্ত এক রাঙা মাটির গ্রাম মির্জাপুরের অতি
সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের তৃতীয় সন্তান দীপঙ্কর বাণুজ্জ্যে।মেধাবী,পাড়ার ক্লাবের
চৌখস ফুটবলার বলেও এলাকাতে বেশ প্রসিদ্ধ সে।কিন্তু তার পায়ের বেড়ি হল একান্নবর্তী গোড়া
রক্ষনশীল পরিবার । বাড়ির কর্তামশাই এর বিধিনিষেধের ফতোয়া সকলের উপরেই প্রযোজ্য।
বিশেষ করে নয় জন ভাইবোনের মধ্যে তার উপর বোঝাটা একটু বেশিই কারণ সে পরিবারের সবচেয়ে
দায়িত্বশীল সন্তান ।এই বোঝাটা সে জন্মগত ভাবেই রপ্ত করেছে।বাড়ির বড়দের ফাই ফর্মাস
খাটা,ভাই বোনদের পড়তে দিয়ে – নিয়ে আসা,জেঠিমা – মা কে ওষুধ এনে দেওয়া, শুধু তাই নয় পাড়ার
কেউ বিপদে পড়লে তার পাশে দাঁড়ানো সবেতেই এক ডাকে হাজির সে।তাই বলে সে কি নিজের কলেজের
পড়াশোনা তে ফাঁকি দিয়ে এসব করে তা কিন্তু নয় রাত জেগে নিজের কাজেও নিখুঁত পারদর্শী

আমাদের দিপু।এর মধ্যেই আন্ত – জেলা ফুটবল ম্যাচ, টেবিল টেনিস ম্যাচ এর পর পর চ্যাম্পিয়ন
সে।আদ্য – পান্ত ভালো মানুষ ছেলেটির পরিবারে নেমে এলো নিকষ
অন্ধকার। অতঃপর জীবনে এক বিরাট ছন্দ পতন। তার পিতা যিনি ছিলেন এলাকার স্টেশন যাস্টার,
দানবীর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক যিনি এই নয় সন্তান কে অকূল পাথারে ভাসিয়ে কার্ডিয়াক
অ্যারেস্ট এ
যারা যান চিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে । ঘটনার সলিল সমাধি ঘটলো তখন যখন তাদের স্নেহময়ী যা
এই শোক কাটিয়ে উঠতে না পারে শয্যা নিলেন।ছোটো ছোটো ভাই বোনেরা তখন বানের জলে ভেসে
যাওয়ার অবস্থা । সাময়িক ভাবে কয়েকজন আত্মীয় এলেন বটে সেসময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে
কিন্তু তা সে কয়েক মাস ।জীবনের নিযয়ে ধীরে ধীরে সকলে নিজের কাজে ফিরে গেলো । তাদের যা'ও
ইহজগত থেকে বিদায় নিলেন। বড় দুই দাদা যাথার উপর ছাদ হওয়ার বদলে কিঞ্চিৎ ভক্ষক হয়ে
উঠলেন বটে ।সুতরাং, গল্পের মূল চরিত্র দিপু হয়ে উঠল একমাত্র সহায়। স্বপ্নের বুনন গুলোতে
গিট পড়তে লাগলো তার।ক্রমে পড়াতে – খেলাতে মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়াই যেন তার ভাগ্য লিখন
ছিল।যাথায় ভাই বোন সংসার এর কুইন্টাল বোঝা । কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাকি ভাই বোন গৌরী, শিব,
ভারতী, বিশ্ব সকলে বাঁচার লড়াই করছে। কথায় আছে বিপদ বিপদের পিছনেই আসে। একদিন রাতে
বাড়িতে শেষ কিছু সম্বল চুরি তে খোওয়া গেলো। পরের দিন নতুন ভোর।নতুন করে বাঁচার অধিকার
নিয়ে বাকিরা দিপু কে জড়িয়ে পথ চলা শুরু করলো । দিপু ও শিব একটা কাজ জুটিয়ে ফেলল।ভারতী ও
গৌরী বাড়ি বাড়ি গান শেখাতো । বিশ্বের অবশ্যি এসব বোঝার বয়সই হয়নি। সময় এগিয়ে চলল। দিপু
তার প্রিয় বান্ধবী নবনীতা কে বিবাহ করলো ওই দুঃসময়েই।বৌদি হয়ে উঠলো মমতাময়ী
মাতৃস্বরূপ।সকলে মিলে খুব কষ্টের কিন্তু শান্তির সংসার।এরপর ছোটবোন ভারতীকে তারা
কলকাতার এক সু পাত্র এর হাতে তুলে দিলো কোনরকম পণ ছাড়াই।শিব তার বাবার যতই বাড়িতে
খুলল হোমিওপ্যাথি ডিসপেনসারি। খুব কষ্টে বাকি দুই ভাই পড়াশোনা শেষে স্কুল মাস্টারি চাকরি
জোগাড় করলে তাদের একটু সুদিন ফিরল।গড্ডালিকা প্রবাহের স্রোতে ভাসা সংসার একের পর এক
নতুন সদস্যদের প্রবেশ ঘটলো। কেউ জুড়ে থাকতে চাইলো, কেউবা ভাঙতে উদ্যত। শুরু হলো ভাইয়ে
ভাইয়ে কোন্দল। অশীতিপর দিপুর মনে অভিযানের পাহাড় স্তূপীকৃত হলো।যে সংসারের সকলকে
একদা একাই সর্বস্ব দিয়ে আগলেছে – তারাই আজ সম্পদ সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে বিবাদরত ।
একইভাবে,গভীর রাতে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, দিপু কোমায় চলে গিয়েছে।কলকাতার সুপার স্পেশালিটি
হাসপাতালে জ্ঞান -অজ্ঞানের ছায়াবৃত্তে কাতর যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। যেটুকু প্রাণশক্তি এখনো
রয়েছে তা দিয়ে মুচকি হাসছে মনে মনে।যাক, ভাইয়েরা এক জায়গায় আমার পাশে আমাকেই আগলে
এক সাথে দাঁড়িয়ে বার
বার বলছে, ভুল ভুল খুব ভুল হয়ে গেছে দাদা গো । ফিরে এসো ..ফিরে এসো..
পরপারে যাওয়ার আগে আরও একবার জিতে গেলো দিপু। শান্তি।শান্তি।নিশ্বাস থেমে গেলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top