3 RD SEM (2023-2025)

তাকাচ্ছে বড় জেঠু,বাবা আর ঠাকুমার থমথমে মুখের দিকে। বুঝতে পারছে,ওরা সাংঘাতিক একটা
অন্যায় করে ফেলেছে। শুধু টুবাই কোমোরে হাত রেখে যুদ্ধং দেহি ভাব নিয়ে ঠাকুমার দিকে তাকিয়ে
আছে।আসলে ও এবার প্রথম বার এসেছে এই গ্রামে, নিজেদের বাড়ির দুর্গাপূজা উপলক্ষে। জন্ম
থেকে এই দশ বছর বয়স পর্যন্ত টেক্সাসেই কাটিয়েছে। বাড়ির পুজোর নিয়ম টিয়ম ঠিক জানে না।
ঠাকুমা বেশ কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন,"টুবাই সত্যি কথা বল।কে বলেছিল তোমাকে একাজ
করতে?" টুবাই বীরবিক্রমে জবাব দিল,"ইটস মি,কেউ বলেন নি।আমি স্বচ্ছায় করেছেন।" আসলে
রবীন্দ্র রচনাবলীর গল্প,বঙ্কিম রচনাবলীর গল্প, মায়ের মুখে শুনে শুনে টুবাই এর বাংলা একটু
বেশীই শুদ্ধ রূপ ধারন করেছে।বেচারা ওই টুকুই তো বাংলা ভাষা শুনতে পায় নইলে সারাক্ষণ ওই
খটর মটর ইংরেজি শুনে দিন কাটে।
ঠাকুমা অনেক কষ্টে নিজের হাসি সংবরন করে গম্ভীর গলায় বল্লেন, "ও মিথ্যে বলতেও শিখে
গেছ!" যাও সবাই উপরে যাও। তারপর দেখি তোমাদের কি শাস্তি দেওয়া যায়?কিন্তু খবরদার
কাউকে যেন মন্ডপে ঘোরাঘুরি করতে না দেখি।"
ব্যাজার মুখে চারজন চললো সিঁড়ির দিকে। ঠাকুমা বড় জেঠুর দিকে তাকিয়ে বললেন, "শীতল যত
তাড়াতাড়ি সম্ভব তুমি নিখুঁত ছাগশিশুর ব্যাবস্থা কর। সন্ধিক্ষণে বলি না হলে অনর্থ ঘটে যাবে।
কতোগুলো শিশুর ছেলেমানুষীর জন্য দু'শ বছরের প্রাচীন প্রথা বন্ধ হয়ে যেতে পারে না। তাছাড়া
গ্রামের মানুষ ভীষণ ভাবে এই সব মঙ্গল, অমঙ্গল বিশ্বাস করে।তাদের বিশ্বাসের গোড়ায় আঘাত
করলে তার ফল যে কি ভয়ানক হতে পারে তা নিশ্চয়ই তোমাকে বলে দিতে হবে না।" জেঠু যদিও
আগেই বাড়ির মুনিশ রঘু আর পাশের বাড়ির শান্তনু কে জড়বেড়িয়ার মোড়ে পঠিয়েছেন ছাগলের
খোঁজে, আর তারা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও নিখুঁত পাঁঠা পায়নি। তবুও তিনি ঘাড় নাড়লেন।মায়ের কথার
ওপর কথা বলতে এখনো তিনি ভয় পান।
মিন্টু,তিতলির বাবা সুনীল বাবু ভয়ে ভয়ে বললেন, "মা,বলছিলাম কি— মানে ধর সেরকম ছাগশিশু
পাওয়া গেল না। তাহলে কি হবে?"
নির্মলা দেবী বেশ কিছুক্ষণ তাঁর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।খুব ভালোভাবেই তিনি তাঁর
এই ছেলেকে চেনেন।এককালে পুরোদস্তুর কম্যুনিস্ট ছিল।এসব প্রথা বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল
অনেকবার। সেই কারণে একবার ভীষণ বিপদের মুখে পড়তে হয়েছিল তাদের পরিবার কে।যদিও
গ্রামের মানুষ এখনো এই বংশের লোকেদের জমিদার হিসেবে ভালই মান্যগণ্য করে, কিন্তু তাদের
সংস্কারে আঘাত লাগলে তারা কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। তাই শেষে হাল ছেড়ে দিয়েছে। নির্মলা
দেবী বোঝার চেষ্টা করছিলেন আজকের এই ঘটনায় সুনীলের পরোক্ষ হাত কি আছে?তাই তিনি কথা
না বাড়িয়ে ভারী গলায় বললেন," পাওয়া যেতেই হবে।"
এদিকে পুজোর ভোগ রান্নায় ব্যাস্ত বড়মা, মা আর পুনি দিদি এসবের বিন্দু বিসর্গও জানেন না।
বড়মা,মিন্টু,তিতলির মা,কে জিজ্ঞেস করলেন,"হ্যাঁ রে রীতা ছোট কোথায় রে?কাল থেকে ভোগ
রান্না করব, ভোগ রান্না করব করে মাথা খাচ্ছিল।এখন তো টিকিও দেখা যাচ্ছে না।" রীতা দেবী
হাসতে হাসতে বললেন,"সে তো সোমের সঙ্গে গ্রাম দেখতে বেরিয়েছে। সেই কাক ভোরে। বিয়ের পর
তো প্রথম বার পুজোয় এল। টুবাই কেও নিয়ে যেতে চাইছিল।কিন্তু সে তো মিন্টু, অন্তুদের সঙ্গে
ছাগল কে কাঁঠাল পাতা খাওয়া তে ব্যাস্ত। কিছুতেই গেল না। জান বড়দি ওই বিচ্ছুগুলো কিছু একটা
দুষ্টুমির প্ল্যান করছে। সারাদিন ফিসফিস গুজগুজ চলছে।" বড়মা হাসতে লাগলেন। "নির্ঘাত গুড়ের
নাড়ু চুরির প্ল্যান।"
হঠাৎ উঠোনে প্রচন্ড চিৎকার চেঁচামেচি শোনা গেল। গ্রামের মাথারা সব এসে জমা হয়েছেন। তারা
কিভাবে যেন জানতে পেরেছেন, এবছর বলি হবে না। নির্মলা দেবী বাড়ির টানা বারান্দায় এসে
দাঁড়াতেই পরান বাঁড়ুজ্যে এগিয়ে এসে বললেন,"একি কথা শুনছি, ঠাকরান। বলি হবে না? আমাদের
গাঁয়ে যদি মা দুগগার কোপ পড়ে তাহলে কি হবে আপনি তো সবই জানেন। ছেলে পিলে নাতি পুতি নিয়ে
বাস করি।এতো বড় অনর্থ ঘটতে দেবেন না মা ঠাকরান।" বাকিরাও
কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু নির্মলা দেবী হাতের ঈশারায় তাদের থামিয়ে দিয়ে বললেন, "আপনারা
শান্ত হোন।বাচ্চারা একটা ভুল করে ফেলেছে,তার জন্য বলি বন্ধ হবে না। নিখুঁত পাঁঠা আনতে লোক
পাঠান হয়েছে।যথানিয়মে বলি হবে।"
বলে তো দিলেন কিন্তু নিখুঁত বলির পাঁঠা পাওয়া খুব সহজ নয়। "কি ভেবে যে ছেলে মেয়েগুলো দড়ি
খুলে ছেড়ে দিল পাঁঠা টা কে জানে? নিছক মজা না কি এর পেছনে মায়ের অন্য ঈশারা আছে?" নানা
রকম চিন্তা মাথায় ঘুরছে নির্মলা দেবীর।
এমন সময় ছাদ থেকে বাচ্চাদের হৈচৈ কানে এল। "ও, ঠাম্মা দেখো দেখো শান্তনু কাকু আর রঘুদা
কোলে করে ছাগল নিয়ে আসছে।" "জয় মা দূর্গা" বলে মাথায় হাত ঠেকালেন তিনি।
ছাগশিশু টিকে সোজা পুজো দালানে নিয়ে যাওয়া হল। সন্ধির আর বেশী দেরী নেই।
বাচ্চাগুলো পুজোর দিনে মন খারাপ করে বসে থাকবে?ভেবে তিনি অনুমতি দিলেন সবাইকে পুজো
দেখার। কিন্তু টুবাই যেই শুনল ওই মিষ্টি ছানা টাকে বলি দেওয়া হবে,তারস্বরে কাঁদতে শুরু
করল।ওর মা বাবাও ততক্ষণে এসে পড়েছে। তাঁরা কি করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না।মন কিছুতেই সায়
দিচ্ছিল না এই নিষ্ঠুর নিয়ম পালন করতে।আবার না মানলে যদি দেবীর প্রকোপ পড়ে সেই ভয় ও
আছে।
ওদিকে আখ বলি, চালকুড়ো বলি হয়ে গেছে।এবার পাঁঠা বলি।পাঁঠা টিকে স্নান করিয়ে ফুলের মালা
পরান হয়েছে। পালান খাঁড়া হাতে তৈরী। এক কোপে বলি দিতে হয় নইলে সেই বলি গ্রহন হয় না।
পুরোহিত জোরে জোরে মন্ত্রোচ্চারণ করছেন। ঢাকের বাজনার চোটে আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না।
হাঁড়িকাঠে বসান হলো ছাগশিশুটিকে। তার পরিত্রাহি ম্যাঁহহ,ম্যাঁহহ চাপা পড়ে গেছে সমবেত জয় মা!
চিৎকারে। পালানের খাঁড়া নেমে আসছে সোজা হাঁড়িকাঠে———এমন সময় একি কান্ড!! ছাগশিশুর
বদলে এ কার মাথা? খাঁড়া টা ছুঁড়ে ফেলে, হাত থেকে পালান। এযে, তার নিজের সন্তান। ছাগশিশু টিকে
জড়িয়ে ধরে আছে।
নিমেষে সারা মন্ডপ জুড়ে নেমে আসে শ্মশানের নিস্তব্ধতা। ঢাকিরা ঢাকবাজাতেও ভুলে গেছে। এই
দশমাসের শিশু কি করে এলো এখানে? তবে কি মা আর চাইছেন না এই বলি? পরান বাঁড়ুজ্যে, "মা, মা
গো সবই তোমার লীলা " বলে সাষ্টাঙ্গে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে।
বাকিরাও এই ঘটনা মায়ের আদেশ হিসেবেই মেনে নিলেন। বেশীর ভাগ মানুষই খুশী হয়েছিল এই
কুপ্রথা বন্ধ হওয়াতে। বলা বাহুল্য সবচেয়ে খুশী হয়েছিল টুবাই। মিন্টুদা, অন্তুদা,তিতলি দিদির
হাত ধরে, "ও মা দিগম্বরী" বলে বলে সে কি নাচ তার!!! প্রথম পূজোর অভিজ্ঞতা তার জীবনের এক
পরম প্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেল।