বিসর্জন

SUKANTA GHOSH B.ED.
1 ST SEM (2024-2026)

ঘাটে উঁচু জায়গাটায় দাঁড়িয়ে ছ’বছরের রনি বিসর্জন দেখছে। সামনের রেলিংটা শক্ত করে ধরেছে দু
হাতে। মাঝে মাঝে ভয়ে পেছন ফিরছে। কাউকে না বলে একাই এদিকটায় এসেছে ও। তাই ভয়। ঘাটে
অনেক গুলো ঢাক একসঙ্গে বাজছে। গলায় গলায় ‘আসছে বছর আবার হবে’ আর হই

হই উল্লাস, সঙ্গে উদ্দাম নাচ। কত্ত দুগ্গা ঠাকুর! এত্ত ঠাকুর তো মায়ের সঙ্গে প্যান্ডেলেও
দেখেনি রনি এই তিন দিনে। সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে ছোটো বড়ো অনেক দুগ্গা ঠাকুর। চারিদিকে কত
ভিড়। রনি অবাক বিস্ময়ে সমস্ত ছবি গেঁথে নিচ্ছে ওর মনে। ও মা-কে জিজ্ঞাসা করত, ‘পুজো হয়ে
গেলে ঠাকুর কোথায় যায় মা’?
মা বলত, ‘পুজোর পর ঠাকুর গঙ্গায় বিসর্জন হয়। তারপর দুগ্গা মা চলে যান স্বগ্গে, শিব
ঠাকুরের কাছে।’
বিসর্জন কী, তখন বোঝেনি সে। আজ ওর কৌতূহল মিটলো। এক এক করে এগিয়ে আসছে দুগ্গা
ঠাকুর আর গোল গোল ঘুরে এগিয়ে যাচ্ছে ঘাটের দিকে। রনি অবাক বিস্ময়ে দেখে। কত
বড় বড় ঠাকুর। ঘাটে নামানোর সময় মনে হচ্ছে এই বুঝি পড়ে যাবে! কিন্তু পড়ে না। একদম নিচে
জলের কাছে নিয়ে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ায় সবাই। রনি ঠাকুরের মুখটা আরেকবার ভালো করে দেখে
নেয়। তারপর হঠাৎই হই হই রব ওঠে, আর ঝপাস করে দুগ্গা ঠাকুর জলে পড়ে ভেসে যায়। আর
তক্ষুনি রনির তল পেটটা কেমন যেন সুর সুর করে ওঠে। বুকের ভিতর একটা উত্তেজনা খেলা করতে
থাকে। রনি দেখতে থাকে ভাসমান মূর্তিটা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে স্রোতের দিকে। জলে ডুবতে থাকা
একটি মাটির মুখ। দুগ্গা ঠাকুর স্বগ্গে যাচ্ছে! দেখতে থাকে, যতক্ষণ না চোখের আড়াল হয়।
আচমকা কাধে একটা চাপ অনুভব করে রনি। মুখ ফিরিয়ে দেখে ছোটকা। একটু বকা শুনতে হয়
প্রথমে। তারপর ছোটকা রনিকে নিয়ে যায় পিছন দিকটায়। এই জায়গাটা একটু অন্য রকম। রনি দেখে
বাবারা একটু দূরে দাঁড়িয়ে। ছোটকা হাত জোড় করে প্রণাম করতে বলে রনিকে। রনি অবাক হয়ে
দেখে, বাবা মায়ের মুখে আগুন ছুঁয়ে দিল, কিন্তু মায়ের কষ্ট হলো না, মা একইভাবে শুয়ে।
কোলাপ্সিবল গেটটা খুলে গেল। ওরা মা-কে নিয়ে ঢুকে গেল। নিস্তব্ধতা চিরে হৃদয়বিদারক কান্নার
রোল উঠলো। রণীর কেমন যেন হতে লাগলো বুকের ভিতরটা। কিছুই বুঝতে পারলো না সে। তবু
শরীরের সমস্ত শক্তি জড়ো করেও রনি পারলো না, ছোটকার হাত ছাড়িয়ে ছুটে গিয়ে মাকে একবার
ছুঁয়ে দেখতে। সঙ্গে সঙ্গে ছোটকা রনিকে সরিয়ে আনলো ঘাটের ধারে। আসার সময় তীব্র একটা
যান্ত্রিক শব্দ শুনতে পেয়েছিল রনি। অনেক প্রশ্ন ঘুরছে ওর মনে। চেষ্টা করেও দ্বিতীয়বার আর
দেখতে পায়নি মায়ের মুখটা। ছোটকার শক্তির সাথে কি ও পারে! এই ঘাটে বিসর্জন হচ্ছে না। রনি
অনেকটা অভিমান নিয়ে ছোটকাকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘মাকে কোথায় নিয়ে গেল?’
ছোটকা নিরব। একবার শুধু নাক টানলো। আর রনির হাতটা শক্ত করে ধরলো।
কিছুক্ষণ একদৃষ্টে ঘাটের জলে কী একটা দেখলো রনি। পাড়ে আটকে থাকা একটা কাঠামো। মাটি
এখনো সম্পুর্ন গলেনি। মুখটা একটু একটু দেখা যাচ্ছে। আরো কিছুক্ষন দেখে কী একটা ভাবলো
রনি। তারপর জিজ্ঞাসা করলো, ‘মা আর আসবে না?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top