বেনামিবন্দর

MALLIKA CHOWDHURY
B.ED. 1 ST SEM (2024-2026)

মৃগাঙ্ক,

এমনটাকিসত্যিদরকারছিল?কেন যে তুমি জোর দিয়ে বারবার হিসেব মেলাতে চাও তা বুঝি না!
এবংবুঝি না বলেই জীবন অন্য মানে নিয়ে ঘিরে ধরে আমাকে।এটা বারংবার হয়েছে।দুঃখ হয়নি,
কষ্ট বা জন্ত্রনা, ক্রোধ কোনটাই হয়নি, শুধুই পঞ্জিভুত হয়েছে অভিমান।ফেলে দিয়েছে আমায়
অতল গহ্বরে।কিন্তু বারবার মনে হয়েছে জীবনের সহস্র মুখ যদি একদিন আবার মিলে যেত,তবে
বুঝি তার চেয়ে সুখের আর কিছু হত না।তাহলে সেই দাঁড়ি পাল্লায় নিজেকে এক বার মেপে নিতাম,
দেখতাম কি পেলাম আরকি পেলাম না।সেইটাই শুরু আর সেইটাতেই হত শেষ।না পাওয়াগুলোকে
পাওয়ার খাতায় তালিকাভুক্ত করারচেষ্টা নিশ্চয়ই করতাম,আর যদিনা পারতাম তবে লাগিয়ে দিতাম
বিদ্রহ।তার আগে জীবনের ছুটিনেই।কিন্তু সেই জীবন আমায় এমন অবহেলায় গড়ে তুলেছে যে
কাঙালের মতন আঁকড়ে ধরে চলেছি আমার পাওয়া গুলোকে,আজীবন।তাই না পাওয়ার মেদুরতা আমার
খুব একটা বেশি নেই।কখনো মনেও হয়নি তাদের একবার হাত ছানি দিয়ে ডাকলে কেমন হয়।যা
পেয়েছি,যাহয়েছে, তার চেয়ে যে অন্য কিছু হতে পারত, এমনটা ভাবতেও আমার ভয় করে।তবে বুঝি

তুমি এই আমি টাকে পেতেনা।

ছোট বেলায় মা বলতেন, “এইরকম পড়াশোনা করলে কোন স্বপ্নই পূরণ হবে না।তোকে তো অনেক
বড় হতে হবে।“ কিন্তু মা হয়তো কোনদিনও বুঝতে পারেন নি,খুব একটা বড় হতে আমি কখনও
চাইনি। আমার বড় হওয়ার স্বপ্ন কোন দিনই দশটা-পাঁচটার নির্দিষ্ট চাকরির ভিতর আবদ্ধ ছিল
না।আমার স্বপ্নছিল না যে পাঁচ-তারার কোন এয়ার-কন্ডিশন ঘরে বসে হাতে গেলাস ধরে, রঙিন

নেশায় বিনিদ্র রজনী পোহাবো।

বিশ্বাস করো মৃগাঙ্ক, এর থেকে অনেক বেশি আমি পেয়েছি।এক আকাশ রোদ, মেঘ ভর্তি বৃষ্টি,
একমাটি সোঁদাগন্ধ, সরোবরে রটলটলে মন উদাসীকরা জলেরওপর ছোট্টছোট্ট সজনে গাছের
পাতা……সব দেখেছি।সব দেখেছে আলোয় আবৃত আমার এই দুইচোখ, বুক ভরে উঠেছে তারই
নামহীন গন্ধে, মন বলেছে, “পেয়েছি, আমি সবই পেয়েছি।“ তাই আমাকে পাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্বে
কখনও পড়তে হয় নি।আমি আজীবন রূপনগরের রাজকন্যার মতন বিরাজ করেছি।
জীবন কি শুধুই আমাদের পাওয়া না পাওয়ার দাঁড়িপাল্লা? শুধুই কি আমরা পেতে এসেছি, দিতে নয়?
জীবন মানেই কি শুধু দৌড়ে চলা? জীবন মানেই কি শুধু হাসি? শুধু কাজ করার অভিপ্রায়?না,না।আমি
সেই যন্ত্র চালিত মানুষদের একজন নই, যাদের মানের প্রাচুর্য হয়তো আছে, কিন্তু হুঁশ আছে কি?
তারা কি কখনও ভেবে দেখেছে একটি ঘাসের আগায় একটি ক্ষুদ্র শিশির বিন্দু কোন ভালোবাসায়
জড়িয়ে থাকে? ভেবে কি দেখেছে যে গ্রামের গরীব বিধবা মা কোন আশায় সব হারিয়েও,তার
একমাত্র বিলেত ফেরত ডাক্তার ছেলের প্রতীক্ষায় প্রতিদিন সন্ধ্যাতলায় প্রদীপজ্বালে, মঙ্গল
কামনা করে,এইটা জেনেও যে তার ব্যস্তছেলে শহর ছেড়ে মায়ের কাছে আর কোনদিনও ফিরে আসবে
না? তারা কি এতোটুকুও আন্দাজ করতে পারে সবপেয়েও একজন সফল মানুষ কেন কাঁদে?জানে কি?
………আমিজানি।আর তাই আমার নোনা ধরা বাড়ির দেওয়াল, শ্যাওলা পড়া বাড়ির উঠোন, অযত্নে
বেড়ে ওঠা নির্জন বাগান, ছাঁদে মেলা…বৃষ্টিতে ভেজা আমার মায়ের চওড়া লাল পেড়ে সাদা শাড়িটা,
না, কোনটাই কখনও ফেলে আসতে পারবনা। এইগুলো শুধুই স্মৃতি নয়, আমার চিরদিনের অভ্যাস
হয়েই থেকে যাবে। কারণ ওই একটাই। আমি জীবনের কাছে অবহেলিত। জীবন আমাকে দৌড়াতে
শেখায়নি, ফেলে আসতে শেখায়নি, ছেড়ে চলে যেতেও শেখায়নি, বরঞ্চ আঁকড়ে ধরতে শিখিয়েছে।
বলেছে ধীরগামী হও, স্নেহময়ি হও, ক্ষমাশীলা হও। বলেছে শান্তি পাবে। তাইতো আজও চির নূতন,
চির যৌবনা, চির স্নিগ্ধা আমি। আমি এ-ত কিছু পেয়েছি। কি করে বলি আমার “এত্ত” কিছু পাওয়া
হয়নি? না, না জীবনের কাছে আমি অকৃতজ্ঞ হতে পারবনা। জীবন কে যে আমি খুব ভালবাসি…।

সত্যিই ভালো আছি।
সত্যিই, তুমিখুব ভালো থেকো।

সাগরপারের…..তরী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top