1ST SEM (2024 – 2026)

কলকাতার বুকে এই এক টুকরো ঘুপচি ঘরে বিশুর ৪০ বছর পার হয়ে গেছে। অবশ্য অন্যত্র বাড়িও
কিনেছে একটা। মাঝেসাঝে সেখানে গিয়ে থাকলেও লোটাকম্বল সহযোগে পৌঁছয়নি আজও। একটা
ফ্ল্যাটের গ্রাউন্ডের এই ঘুপচি ঘর, বিশুর ৪০ বছরের স্মৃতির আকর। ঘরের আনাচ আর কানাচ
বলতে যা আছে, সবই স্মৃতির ভারে বোঝাই করা জিনিসে ঠাসা। বন্যার জলে তারা ডোবে, ভাসে,
আবার শুকিয়ে যায়। ঘাঁটি গেড়ে বসে।
এই জিনিসগুলোর কোনোটা তাঁর মৃত স্ত্রীর ব্যবহার করা। কোনোটা তাঁর খুব প্রিয় কোনো বন্ধু
দিয়েছে, যে কিনা ২০ বছর আগে মারা গেছে। কোনোটা রথীন বাবু দিয়েছিল, কোনোটা রুকু দিদি খুশি
হয়ে দিয়েছিল। আবার কোনোটা দীর্ঘজীবি, তাই সেটাও ফেলনা নয়। মানুষেরা মরে যায়, পুড়ে গিয়ে
ভেসে যায়, পচে গিয়ে মিশে যায়। আর এই জিনিসগুলো মরে না। ছাই হয়ে উবে যায় না। পচে গেলেও
ভেঙে গেলেও টিকে থাকে। থেকে যায়। তাই মানুষেরা এসব কিছু আগলে ধরে বসে থাকে। মৃত মানুষের
গন্ধ শোঁকে। বিশুও তাই করে। আজও কাজ সেরে এই ঘরে ফিরে শান্তির ঘুম দেয়। সে নয়। স্মৃতিরা
তাকে আগলে ধরে, মাথায় হাত বোলায়, ঘুম পাড়ায়।
২
এরকম অজস্র স্মৃতির স্তূপের মাঝে একটা টেবিল ফ্যান আছে। ওটা নিজে থেকে চলেনা। কয়েলে
বারবার তেল দিয়ে পাখার ব্লেডটাকে ১০বার একটা পেন বা চিরুনি দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিশুর ছোট
মেয়ে মুন্নি চালায়। এই পাখাটা মাত্র পাঁচ বছর হয়েছে। তাই ফেলনা নয়।
ওদের ঘরে একটা ফ্রিজ আছে। বিশুর ফ্রিজ রিপিয়ারিং এর নিজস্ব দোকান আছে। সেখানে একটা
লোক এই ফ্রিজ বিক্রি করে গেছিল, স্বল্প দামে, আজ থেকে প্রায় ৮ বছর আগে। সারিয়ে সারিয়েই
ভাড়া দিত। টাকা পেত ভালোই। সেই অভাবের দিনে এই ফ্রিজের কথা মনে করে বলে, এটা তার
লক্ষ্মী ফ্রিজ। যে আজও টিকে আছে। তাই ফ্রিজে বরফ না জমলেও, হ্যান্ডেল-এ ছোঁয়া লাগলেই
কারেন্ট লাগলেও, দুটো পা না থাকলেও কোনোমতে ইট দিয়ে সাপোর্ট দিয়ে সেটা বাড়িতেই রেখেছে।
লক্ষ্মী তো! ঘরেই থাকুক।
ওদিকে রান্নাঘরের কাঠের র্যাকটাও একটা বড় স্মৃতি। বিশুর স্ত্রী যখন বেঁচে ছিল তখন অনেক
জোর করে এই কাঠের র্যাকটা আনিয়ে ছিল। সাধ করে সেটা সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছিল। রোজ মুছত,
গুছিয়ে রাখতো মশলার কৌটো, বাসনগুলো। আজ ওটার কাঠগুলো পচে গেলেও, আছে। থাকুক। ওটা খুব
প্রিয় একটা স্মৃতি।
৩
খুব গরম লাগছে মুন্নির। স্নান করে এসে টেবিল ফ্যানের ব্লেড টা ঘোরাচ্ছে জোর দিয়ে। তবু
চলছেনা। ঘোরাতে ঘোরাতে কয়েল পুরে গেল, আগুন স্পার্ক করে উঠলো, মুন্নির ছিটকে
পড়ে,কারেন্ট শর্ট লেগে। পুড়তে থাকা পাখাটা উল্টে পড়ল।
একদিন বিশুর দ্বিতীয়া স্ত্রী ফ্রিজ খুলতে গিয়ে একটা ইট সরে যায়। ফ্রিজটা ডিসব্যালেন্স হয়ে
ওর গায়ের ওপর পড়ে। মাথাটা থেতলে যায়।
কিছুদিন পর বিশুর আরেক মেয়ে ছন্দা রান্নাঘর পরিষ্কার করার সময় কাঠের র্যাকের নিচটাও
জল ঢেলে ঢেলে ঝাড় দিচ্ছিল। একটা বিষাক্ত সাপ ছিল ওখানে। ও দেখেনি। বাসা করেছিল ওখানে।
ঝাড়ুর কাঠি গায়ে লাগতেই বেরিয়ে এসে ছোবল দেয় ওর হাতে। মূহুর্তে মুখ থেকে ফেনা বেরোতে
থাকে।
৪
বিশু এখনও এই ঘরেই আছে। স্মৃতির পাল্লা ভারী হয়েছে আরও। কি করে যাবে ও এখান থেকে?
মেয়ে বউয়ের স্মৃতিরা মাথায় হাত বোলায়। বিশু শান্তিতে ঘুম দেয়।